স্ট্রোক পরবর্তী করণীয়? সম্পূর্ণ পুনর্বাসন গাইড

স্ট্রোক একটি জটিল কিন্তু প্রতিরোধযোগ্য স্বাস্থ্য সমস্যা। এটি ঘটে যখন মস্তিষ্কে রক্তপ্রবাহ হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায় বা রক্তনালী ফেটে যায়, ফলে মস্তিষ্কের কোনো অংশ অক্সিজেন পায় না। এর ফলে শরীরের একপাশ অবশ হয়ে যেতে পারে, কথা জড়িয়ে যেতে পারে, বা দৃষ্টি ঝাপসা হতে পারে।
তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো — স্ট্রোকের পর সঠিক করণীয়গুলো জানা ও তা মেনে চলা। কারণ, সময়মতো সঠিক যত্ন নিলে রোগী দ্রুত সুস্থ হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেন।

 

স্ট্রোকের পর কী করণীয়?

স্ট্রোকের চিকিৎসা শেষ হওয়ার পর শুরু হয় আসল লড়াই — পুনর্বাসনের লড়াই। নিচে ধাপে ধাপে গুরুত্বপূর্ণ করণীয়গুলো তুলে ধরা হলো 

 

চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলা

স্ট্রোকের পর প্রতিদিনের চিকিৎসা ও ওষুধ সঠিকভাবে অনুসরণ করা অত্যন্ত জরুরি।

রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও কোলেস্টেরল নিয়মিত মাপতে হবে।

 

চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো ওষুধ বন্ধ বা পরিবর্তন করা যাবে না।

 

প্রতি নির্দিষ্ট সময়ে ফলোআপ করতে হবে।

 

মনে রাখবেন, স্ট্রোকের পর আবার স্ট্রোক হওয়ার ঝুঁকি ২৫–৩০% পর্যন্ত হতে পারে যদি চিকিৎসা অবহেলা করা হয়।

 

ফিজিওথেরাপি – পুনর্বাসনের প্রথম ধাপ

ফিজিওথেরাপি – পুনর্বাসনের প্রথম ধাপ

স্ট্রোকের পর হাত-পা দুর্বল বা অবশ হয়ে যাওয়া স্বাভাবিক। ফিজিওথেরাপি এই সমস্যার সমাধানে সবচেয়ে কার্যকর চিকিৎসা পদ্ধতি।

 ফিজিওথেরাপির মাধ্যমে যা করা হয়ঃ

হাত-পা ও পেশির শক্তি ফিরিয়ে আনা

 

হাঁটা, বসা ও ভারসাম্য ঠিক রাখা

 

দৈনন্দিন কাজ যেমন খাওয়া, দাঁড়ানো, পোশাক পরা শেখানো

 

শরীরের কো-অর্ডিনেশন পুনরুদ্ধার করা

 

 নিয়মিত ফিজিওথেরাপি নিলে রোগীর ৭০% পর্যন্ত উন্নতি দেখা যায়।

অকুপেশনাল থেরাপি

অকুপেশনাল থেরাপি (Occupational Therapy) রোগীর দৈনন্দিন কাজকর্মে আত্মনির্ভর হতে সাহায্য করে।
এই থেরাপিতে রোগী নিজে নিজে কাজ করা যেমন – খাওয়া, গোসল করা, দাঁত ব্রাশ করা বা রান্না শেখেন।

 এটি রোগীর আত্মবিশ্বাস বাড়ায় এবং মানসিকভাবে শক্তিশালী করে তোলে।

 

স্পিচ ও ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপি

স্ট্রোকের পর অনেকের কথা বলার বা বুঝতে পারার সমস্যা দেখা দেয়। একে বলা হয় Aphasia
এই সমস্যা কাটাতে স্পিচ থেরাপি অত্যন্ত কার্যকর।

থেরাপির মাধ্যমে যা করা হয়ঃ

উচ্চারণ অনুশীলন

 

কথা বলার গতি ও স্বচ্ছতা বাড়ানো

 

শব্দ মনে রাখার ক্ষমতা বৃদ্ধি

 

 নিয়মিত অনুশীলনে রোগী ধীরে ধীরে স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে সক্ষম হন।

বায়োফিজিক্যাল থেরাপি

স্ট্রোক রোগীদের পুনর্বাসনে এখন বায়োফিজিক্যাল থেরাপি জনপ্রিয় ও আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতি।
এটি ফিজিক্যাল ও ইলেকট্রনিক থেরাপির সমন্বয়, যা স্নায়ু ও পেশিকে উদ্দীপিত করে।

এতে ব্যবহৃত থেরাপিগুলোর মধ্যে রয়েছে —

এই থেরাপিগুলো পেশির কার্যক্ষমতা ফিরিয়ে আনে, ব্যথা কমায় এবং রক্ত সঞ্চালন বৃদ্ধি করে।

 

খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আনুন

স্ট্রোকের পর খাদ্যাভ্যাস নিয়ন্ত্রণ করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

যা করবেনঃ

লবণ ও তেল কম খান

 

চর্বিযুক্ত ও প্রক্রিয়াজাত খাবার পরিহার করুন

 

তাজা ফল, সবজি ও আঁশযুক্ত খাবার খান

 

পর্যাপ্ত পানি পান করুন

 

অ্যালকোহল ও ধূমপান থেকে বিরত থাকুন

 

ডায়েটিশিয়ানের পরামর্শ অনুযায়ী খাবারের তালিকা তৈরি করলে আরও দ্রুত ফলাফল পাওয়া যায়।

 

মানসিক পুনর্বাসন

স্ট্রোকের পর অনেক রোগী হতাশা, ভয় বা মানসিক চাপের মধ্যে ভোগেন। তাই মানসিক পুনর্বাসন খুবই জরুরি।

সহায়তার উপায়ঃ

পরিবার ও বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে যোগাযোগ রাখুন

 

কাউন্সেলিং বা সাপোর্ট গ্রুপে যোগ দিন

 

নিয়মিত মেডিটেশন ও শ্বাস-প্রশ্বাসের অনুশীলন করুন

 

মনে রাখবেন — মানসিক স্থিতিশীলতা শারীরিক উন্নতির গতি অনেক বাড়িয়ে দেয়।

 

পুনরায় স্ট্রোক প্রতিরোধে করণীয়

পুনরায় স্ট্রোক প্রতিরোধে করণীয়

একবার স্ট্রোক হওয়ার পর আবার স্ট্রোক হওয়ার আশঙ্কা অনেক বেশি। তাই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।

প্রতিরোধের টিপসঃ

রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখুন

 

প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট হাঁটুন

 

ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন

 

পর্যাপ্ত ঘুম নিন

 

মানসিক চাপ কমান

 

নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও স্বাস্থ্যকর অভ্যাসই হতে পারে দ্বিতীয় স্ট্রোকের বিরুদ্ধে আপনার ঢাল।

স্ট্রোক থেকে সুস্থ হতে কত সময় লাগে?

স্ট্রোকের মাত্রা ও চিকিৎসা শুরু করার সময়ের উপর নির্ভর করে সেরে ওঠার সময় ভিন্ন হতে পারে।

  • হালকা স্ট্রোক: ৩–৬ মাসে উল্লেখযোগ্য উন্নতি 
  • মধ্যম স্ট্রোক: ৬ মাস–১ বছর 
  • গুরুতর স্ট্রোক: ১ বছর বা তার বেশি 

নিয়মিত থেরাপি ও অনুশীলনই দ্রুত আরোগ্যের মূল চাবিকাঠি।

 

উপসংহার

স্ট্রোক থেকে সুস্থ হওয়া শুধু চিকিৎসার ওপর নির্ভর করে না, বরং সঠিক যত্ন, থেরাপি ও মানসিক দৃঢ়তার ওপরও নির্ভরশীল।
ফিজিওথেরাপি, অকুপেশনাল থেরাপি, স্পিচ থেরাপি ও বায়োফিজিক্যাল থেরাপির সঠিক সমন্বয় স্ট্রোক রোগীকে পুনরায় স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে সহায়তা করে।

NHC Trust স্বনির্ভর জীবনের পথে নিয়ে যেতে সামর্থ্যের মধ্যেই অত্যাধুনিক ফিজিওথেরাপি ও বায়ো ফিজিক্যাল থেরাপি ব্যবস্থা পরিচালনা করে থাকে।

অভিজ্ঞ ফিজিওথেরাপিস্ট ও বায়োফিজিক্যাল থেরাপির মাধ্যমে স্ট্রোক পুনর্বাসনের জন্য যোগাযোগ করুন:
01931405986, 01910701955  

অথবা ভিজিট করুনঃ https://www.nhctrust.org/contact-us/

 

Leave a Comment